Loading...

জীবন রসিক রবীন্দ্রনাথ

কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়

(উক্তির মধ্যে তৎকালীন ভাষা ও বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
ছেলেটি ভারি দুরন্ত। মাথায় সবসময়ই দুষ্টুবুদ্ধি খেলছে। এ হেন ছেলেকে ভর্তি করা শান্তিনিকেতনে। তখন নগেন আইচ অঙ্কের জাঁদরেল মাস্টারমশাই।  তিনি অঙ্ক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করলেন- ১২টার মধ্যে যে কোনও ১০ টা অঙ্ক কষতে হবে।
ছেলেটির কছে সেটা কোনও সমস্যাই নয়। ছেলেটি ১০ টা অঙ্ক তো করলই, উপরন্তু ‘দুটাই বা বাকি থাকে কেন’ ভেবে করে ফেলল। তার পরেও হাতে সময় রইল। শেষপাতায় একটা যুতসই পদ্যও লিখে দিল। শুধু একটাই চিন্তা। নগেন স্যর কি এবার তাহলে একশোতে একশো কুড়ি দেবেন তাঁকে?
বেশিক্ষণ অবশ্য তাঁকে চিন্তা করতে হল না। বিকেলে ভুগোলের পরীক্ষায় সে যখন অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ নিয়ে মহাসাগরে প্রায় ডুবতে বসেছে, সেইসময় রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে অঙ্ক পরীক্ষায় তার সেই উত্তরপত্র নিয়ে নগেনবাবুর প্রবেশ।
পরবর্তী কথোপকথন সেই ছেলেটা তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিল। প্রথম বক্তা নগেনবাবু, দ্বিতীয়জন ছেলেটি।
“এ কী করিয়াছ?”
“আজ্ঞে, ভুল হইয়াছে কী?”
“ভুলের কথা হইতেছে না, ভুল ছাড়া তুমি কী করিবে? কিন্তু শেষ পৃষ্ঠায় এটা কী?”
“একটি কবিতা।“
“একে তো সবগুলি অঙ্ক ভুল করিলে,সে কথা ধরি না, কবিতা লিখিতে গেলে কেন?”
“হাতে কিছু সময় ছিল,ভাবিলাম কেন নষ্ট করিব তাই কবিতাটা লিখলাম।“
ততক্ষনে কয়েকজন অধ্যাপক আসিয়া জুটিয়াছেন-ব্যাপার কী?
“দেখুন ছোকরার কাণ্ড। অঙ্কগুলি তো সব ভুল করিয়াছে, সে কথা ধরি না, উহার কাছে সদুত্তর কেউ প্রত্যাশা করে না, তারপরে কি না অঙ্কের খাতায় কবিতা!”
“এখন একে নিয়ে কী করা যায় বলুন?”
কে কী বলিবেন। কারণ এরকম অপরাধের নজির আশ্রমের ইতিহাসে নাই- কাজেই সকলে গভীর চিন্তার নীরবতা অবলম্বন করিলেন।
“চলিলাম আমি গুরুদেবের কাছে।“
গুরুদেব খাতাখানা আগাগোড়া দেখিয়া বলিলেন,”নগেন, অঙ্কগুলা তো হয় নাই তা দেখাই যাইতাছে, কিন্তু যাই বলো বাপু, কবিতাটা কিন্তু তো হইয়াছে। আহা কী সরল স্বীকারোক্তি ও আন্তরিকতা। শোনো-না-
হে হরি হে দয়াময়
কিছু মার্ক দিয়ো আমায়।
তোমার শরণাগত
নহি সতত
শুধু এই পরীক্ষার সময়।
“ওর বয়সের কথা ছাড়িয়া দাও, এমন কয়জন ভক্ত কবি আছে যে প্রশ্নপত্রের দশটা অঙ্কের উদ্যত দশখানা খড়গের সম্মুখে দাঁড়াইয়া এভাবে আত্মনিবেদন করিতে পারে। ওকে অঙ্ক কষাইতে চেষ্টা কর, তাই বলিয়া কবিতা লেখায় বাধা দিয়ো না।“
বিচারে সর্বস্বখোয়ানো মুখচ্ছবি নগেনবাবু প্রবেশ করিয়া খাতাখানা আমার দিকে ছুঁড়িয়া দিলেন,”নাও, এখন থেকে অবাধে কবিতা লিখিয়া যাও, কেহ বাধা দিবে না।“
গুরুদেব আর কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ আর যে ছেলেটি তাঁর রসবোধের কারণে সে যাত্রা রেহাই পেল সে হল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ও পরবর্তীকালে প্রখ্যাত লেখক প্রমথ নাথ বিশী । প্র.না.বী  (এই সংক্ষিপ্ত নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি)তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ বইয়ে উপরে বলা কাহিনী সহ কবির রসবোধের অজস্র উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখছেন,”লঘুতম কথাবার্তা হইতে মোচড় দিয়া তাহার রস আদায় করিবার ক্ষমতা, অভাবনীয়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া তাঁহার রস সৃষ্টির শক্তি, শিশুমনের সঙ্গে সমসূত্রে নিজেকে অনায়াসে স্থাপন- এ সমস্তই রবীন্দ্র চরিত্রের বৈশিষ্ঠ্য।“
সাধারন আটপৌরে দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে বাঁধা কাজের মধ্যেও রস খুঁজে নেওয়াই ছিল পরিহাসপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের বৈশি্ষ্ট্য।
চুল কাটা
শান্তিনিকতনে রবীন্দ্রনাথ সবার অলক্ষ্যে চুল কেটেছেন। কিন্তু তাঁর ভক্তদের সেটা পছন্দ হয়নি। সেটা বুঝেই কবি কিভাবে সব দিক সামাল দিচ্ছেন তাও উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের সচিব অনিল চন্দের পত্নী ও লেখিকা রাণি চন্দের  “আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ”  নামের এই স্মৃতিকথায়। 
”ভালো লাগে না দেখতে গুরুদেব যখন তাঁর মাথার সু্ন্দর চুলের গুচ্ছ থেকে থেকে কেটে ফেলেন। তাঁর চুলে তাঁর যেন কোনো অধিকার নেই এমনিই ভাবখানা ছিল আমাদের। হঠাৎ হঠাৎ এক-একদিন যখন তাঁর চুলের এই অবস্থা দেখতুম, অভিমান অনুযোগের অবধি থাকত না। সেদিন তাঁর ঘরে ঢুকতেই গুরুদেব দু-হাতে তাঁর ঘাড়ের কাছে হাত বুলোতে বুলোতে-আমি চেঁচামেচি করবার আগেই-বলে উঠলেনঃ মাথার চুল কেটে বোঝা কমিয়েছি। অকারণে মাথায় বোঝা বয়ে বেড়ানো কি বুদ্ধিমানের কাজ! আর আমার মাথার গড়নও তো আর খারাপ নয় যে, ঢেকে বেড়াতে হবে। কী বলিস। 
বলব আর কি। কিছু বলবার আগেই তো কৈফিয়ত দিয়ে দিলেন। মুখ ভার করবারও অবসর পেলুম না।“
প্রখ্যাত লেখক সম্পাদক  ও কবির মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাতা প্রমথ চৌধুরি ‘রবী্ন্দ্রনাথ’ বইতে লিখছেন,”আমি পাশের ঘর থেকে তাঁর ও তাঁর সহচরদের কথাবার্তা শুনতুম। তাঁর কথোপকথন আমাকে মুগ্ধ করত। তাঁর রসিকতার চুমকি বসানো কথাবার্তা ও তাঁর মনের স্ফুর্তি আমাকে অবাক করত।….রবীন্দ্রনাথের কথোপকন যেমন মনোহারি তেমনি উজ্জ্বল, তা আমি হৃদয়ঙ্গম করি। রবীন্দ্রনাথের গদ্যসাহিত্য যে রসিকতায় চমকপ্রদ, তা আশা করি সকলেই জানেন। এ গুণ কবিত্বশক্তির মতই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ। বড় কবিও যে অসাধারন witty হতে পারেন, ইনিই তার প্রমান।“
তাই স্বাভাবিক ভাবেই কৌতুহল হয় জানতে মানুষ রবীন্দ্রনাথকে। তিনি আত্মজীবনী কিছুটা লিখেছেন, কিন্ত সেখানেও যে তিনি আদতে অধরা তাও বলেছেন,”কবিরে পাবে না তাহার জীবনচরিতে।“
তাহলে উপায়? 
উপায় হল তাঁর রচনার মধ্যে তাঁকে চেনার প্রয়াস করা, উপায় হল তাঁর সংস্পর্শে দেশবিদেশের যে সব গুণীজন এসেছেন তাঁদের স্মৃত্বির ঝাঁপি খুঁজে দেখা। আর তাতেই এক সুরসিক রবীন্দ্রনাথের দেখা মেলে, যার রসিকতাবোধ বাস্তবের পাথুরে সত্যে মাথা খুঁড়ে মরে না, বরং আশপাশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন রুক্ষ মরুভূমে প্রশান্তির মরুদ্যান। বিষাদের মধ্যেও অনাবিল আনন্দের ফল্গুধারা। সেই নিঃসীম রসবোধধারার কয়েক আজলা এখানে পরিবেশন করা হল।
কবির প্রিয় শান্তিনিকেতনেই ছড়িয়ে রয়েছে কত না স্মৃতি মাণিক্য।
কবির দণ্ডদান
শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক বিধুশেখর শাস্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথ একবার লিখে পাঠালেন, “আজকাল আপনি কাজে অত্যন্ত ভুল করছেন। এটা খুবই গর্হিত অপরাধ। এজন্য আগামীকাল বিকেলে আমি আপনাকে আমি দণ্ড দিব।”
গুরুদেবের এমন কথায় শাস্ত্রী মশাই তো একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। এমন কী অন্যায় তিনি করেছেন যার জন্য তাঁর দণ্ডপ্রাপ্য?
চিন্তিত ও শঙ্কিত শাস্ত্রী মশাই নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পরদিন উপস্থিত হলেন কবির কাছে। তখনো তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ উৎকণ্ঠার মধ্যেই বসিয়ে রাখেন কবিগুরু। অবশেষে পাশের ঘর থেকে একটি মোটা লাঠি হাতে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ। শাস্ত্রী মশাই তখন ভয়ে কাণ্ডজ্ঞান লুপ্তপ্রায়। তিনি ভাবলেন, সত্যি বুঝি লাঠি তাঁর মাথায় পড়বে। কবি সেটি বাড়িয়ে ধরে বললেন, “এই নিন আপনার দণ্ড! সেদিন যে এখানে ফেলে গেছেন, তা একদম ভুলে গেছেন আপনি!”
বিখ্যাত লেখক জগদানন্দ রায়দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতনে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। 
ভদ্রতার পাঠ
একদিন শান্তিণিতনিকেতনের ছেলেদের সঙ্গে অন্য এক প্রতিষ্ঠানের ছেলেদের ফুটবল খেলা ছিল। শান্তিনিকেতনের ছেলেরা আট-শূন্য গোলে জিতে। সবাই দারুণ খুশি। তবে এ জয় দেখে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করলেন “জিতেছে ভালো, তা বলে আট গোল দিতে হবে? ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে!”
চিনিকে চেনা
এইচ পি মরিস শান্তিনিকেতনে ইংরাজী ও ফরাসি পড়াতেন। তিনি একবার তাঁর ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, গুরুদেব সুগার অর্থাৎ চিনি নিয়ে একটা গান লিখেছেন। যেটা খুবই মিষ্টি হয়েছে। 
প্রমথনাথ বিশী সেকথা শুনে বললেন চিনি নিয়ে লিখলে সেটা তো মিষ্টি হবেই। তা গানটা কী? মরিস সাহেব গাইলেন, 'আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী।' 
এটা শুনে প্রমথনাথ বিশী বললেন, গানটাতে বেশ কয়েক চামক চিনি মিশিয়েছেন গুরুদেব। তাই এতো মিষ্টি। তবে এই চিনিই যে সুগার সেটা আপনাকে কে বললো?
মরিস সাহেব জানালেন কে আবার স্বয়ং গুরুদেব নিজেই তাঁকে একথা জানিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ রসিকতা করেছেন বুঝে প্রমথনাথ আর মরিসের ভুল ভাঙালেন না।
কেউ কাজ দেয় না
রবীন্দ্রনাথ উত্তরায়ণের বারান্দার এক কোণে টেবিল চেয়ারে বসে লিখতেন। সেদিনও লেখায় মগ্ন ছিলেন তিনি। একজন সাঁওতাল মেয়ে বাগানের ঘাস পরিষ্কার করে বিকেলে রবীন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়াল। রবীন্দ্রনাথ তার দিকে তাকাতেই বলল, ‘হ্যাঁ রে, তুর কী কুন কাজ নেই? সকালবেলা যখন কাজে এলাম দেখলাম এখানে বসে কী করছিস! দুপুরেও দেখলাম এখানে বসে আছিস আবার সনঝেবেলা আমাদের ঘরকে যাবার সময় হয়েছে এখনো তুই এখানে বসে আছিস, তুকে কী কেউ কুন কাজ দেয় না?’
রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে হেসে হেসে এ গল্পটা বলে বলতেন, ‘ দেখেছ সাঁওতাল মেয়ের কী বুদ্ধি! আমার স্বরূপটা ও ঠিক ধরে ফেলেছে।’

বই-বাহিক
রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তখন শান্তিনিকেতনের  দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পড়াশুনা করার জন্য  প্রতিদিনই গ্রন্থাগার থেকে বোঝা বোঝা বই নিয়ে  যেতেন। রাতে রাতে সেগুলি পড়তেন। একদিন বিকেলে বইয়ের বোঝা নিয়ে তিনি বাড়ি যাচ্ছিলেন। এমন সময় দূর থেকে কবিগুরুর ডাকলেন, ‘ওহে   বৈবাহিক, শোনো শোনো!’
প্রভাতবাবু ভীষণ  অবাক হয়ে গুরুদেবের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাকে  বৈবাহিক বলছেন কেন?’
গুরুদেব হেসে বললেন ‘আরে সে  বৈবাহিক নয়, আমি তোমাকে ডাকছি বই-বাহিক বলে।’
তাঁর চারপাশের মানুষদের সঙ্গেও কম মজা করতেন না রবীন্দ্রনাথ। একেক জনকে একেক নাম দিতেন। আর তা নিয়ে নানান মজার ঘটনাও হত।


সজীব চেয়ার
একবার বেয়াইবাড়িতে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে কবিকে যথারীতি আপ্যায়ন করে একটি গদিমোড়া কেদারায় বসতে দেওয়া হলো। রবীন্দ্রনাথ কেদারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “ওহে, এটা সজীব নয় তো?”
চেয়ার আবার সজীব! সবাই ভাবলেন, রবীন্দ্রনাথ এ আবার কী বলছেন! চেয়ার বা কেদারা কাঠের তৈরি, জড় পদার্থ! তা আবার সজীব হয় নাকি?
সবার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে এবার হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। বললেন, “অত ভাববার কী আছে? আমি বলছি— চেয়ারটা সজীব মানে ছারপোকা টারপোকা ভর্তি নয় তো?” এ কথা শুনে এবার সবাই হাসতে লাগলেন।

বিভিন্ন গুণীজনের সঙ্গেও কবির রসিকতার নানা মণিমুক্ত ছড়িয়ে আছে।
পাদুকা পুরাণ
তাঁর একটা অভ্যাস ছিল, যখনই তিনি কোনও নাটক বা উপন্যাস লিখতেন, সেটা প্রথম দফা শান্তিনিকেতনে গুণীজন সমাবেশে পড়ে শোনাতেন। কথাশিল্পী শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রায়ই এরকম পাঠের আসরে যোগদান করতেন। তা, একবার আসরে যোগদানকালে বাইরে জুতা রেখে আসায় সেটা চুরি গেলে অতঃপর তিনি জুতা জোড়া কাগজে মুড়ে বগলদাবা করে আসরে আসতে শুরু করে দিলেন।
রবীন্দ্রনাথ এটা টের পেয়ে গেলেন। তাই একদিন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে এভাবে আসরে প্রবেশ করতে দেখে তিনি বলে উঠলেন, “শরৎ, তোমার বগলে ওটা কি পাদুকা-পুরাণ?” এ নিয়ে সেদিন প্রচণ্ড হাসাহাসি হয়েছিল।

বলাই তো কাজ
সাহিত্যিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়, যাঁর ছদ্মনাম বনফুল, এক সভায় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা শেষ হলে সবাই তাঁর বলার প্রশংসা করলেন। সভায় উপস্থিত রবীন্দ্রনাথও তাঁর বক্তৃতার প্রশংসা করে বললেন, “একটা কথা আপনারা সবাই ভুলে যাচ্ছেন কেন— বলাই তো ভালোই বক্তৃতা দেবে, ওর নামই যে বলাই। বলাই তো ওর কাজ।” কবিগুরুর মুখে এই কথা শুনে সভায় হাসির রোল উঠল।

তৃতীয় রসস্রষ্টা

সাহিত্যিক বনফুল সস্ত্রীক রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করতে এলেন । বনফুলের স্ত্রী  কবির জন্য ঘরের দুধ দিয়ে সন্দেশ  তৈরি করে নিয়ে গেলেন। কবির হাতে সন্দেশের কৌটো দিতেই  কবি একটা সন্দেশ মুখে পুরে বললেন, ‘এ সন্দেশ তুমি ভাগলপুরে পেলে কী করে?’
বনফুল তার গৃহিণীকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ইনি করেছেন। আমাদের গাই আছে, তারই দুধ থেকে হয়েছে।’
রবীন্দ্রনাথ ক্ষিতিমোহন সেনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, ‘এত বড়ো চিন্তর কারণ হলো!’
‘ কেন?’
‘বাংলাদেশে দুটি মাত্র রসস্রষ্টা আছে। প্রথম দ্বারিক, দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এযে তৃতীয় লোকের আর্বিভাব হলো।’
মিষ্টি হাসিতে ভরে উঠলো তাঁর মুখ।

বলাই না, এ যে সানাই
স্বনামধন্য সাহিত্যিক ‘বনফুল’ তথা বলাইচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ছোট ভাই বিশ্বভারতীতে অধ্যয়নের জন্য শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই একজনের কাছে জানতে পারেন, বয়স হওয়ার কারণে রবীন্দ্রনাথ কানে একটু কম শোনেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তিনি যখন বললেন, “কী হে, তুমি কি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি?” তখন বলাইচাঁদের ভাই চিৎকার করে জবাব দিলেন, “আজ্ঞে না, আমি অরবিন্দ।” রবীন্দ্রনাথ তখন হেসে উঠে বলেন, “না কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে শানাই!”
দেহরঞ্জন দ্বিজেন্দ্রলাল
একবার এক দোলপূর্ণিমার দিনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবি, নাট্যকার ও গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাক্ষাৎ ঘটে। তো, পরস্পর নমস্কার বিনিময়ের পর হঠাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর জামার পকেট থেকে আবির বের করে রবীন্দ্রনাথকে বেশ রঞ্জিত করে দিলেন।
আবির রঞ্জিত রবীন্দ্রনাথ রাগ না করে বরং সহাস্যে বলে উঠেন, “এত দিন জানতাম দ্বিজেন বাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও দ্বিজেন্দ্রলাল একজন ওস্তাদ।”
“ওরে আমি সত্যি মরিনি”
একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন নাটকের মহড়া চলছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। নাটকে রঘুপতির ভূমিকায় ছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো), আর জয়সিংহ সেজেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। একটা দৃশ্য ছিল এমন, জয়সিংহের মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়বেন শোকার্ত রঘুপতি।
দৃশ্যটার মহড়া চলছিল বারবার। দীনেন্দ্রনাথ বাবু ছিলেন স্থূল স্বাস্থ্যের অধিকারী। মহড়ায় বারবার তাঁর ভার বহন করা রবীন্দ্রনাথের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। একবার দীনেন্দ্রনাথ একটু বেকায়দায় রবিঠাকুরের ওপর আছড়ে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ কেঁকিয়ে উঠে বললেন, “ওহে দিনু, মনে করিসনে আমি সত্যি সত্যিই মারা গেছি!”
ষাট বছর ধরে বিষ খাওয়া
একবার রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী একসঙ্গে বসে প্রাতরাশ করছিলেন। তো গান্ধীজী লুচি পছন্দ করতেন না, তাই তাঁকে ওটসের পরিজ খেতে দেওয়া হয়েছিল। আর রবীন্দ্রনাথ খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি। গান্ধীজী তাই দেখে বলে উঠেন, “গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছ।” উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বিষই হবে; তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। কারণ, আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খেয়েই বেঁচে আছি!”
আত্মজীবনী লেখা
রাণি চন্দ কবির আত্মজীবনী লেখা প্রসঙ্গে এক মজার ঘটনা বলেছেন। রাণী লিখছেন,”সকালে প্রায় রোজই আমাকে ইংরেজি পড়ান। আজ কয়েকদিন থেকে পড়ছিলাম Maxim Gorky এর র My university days বইখানি। এই বইখানি হাতের কাছে ছিল, তিনি বললেন,”ভালই হল। এখানা আমার পড়া হয়নি, তোকে পড়াতে পড়াতে আমারও পড়া হয়ে যাবে। “আজ অনেকক্ষন ধরে বইটি পড়া হল। গুরুদেব জোরে জোরে পড়ছেন আর আমি নীচে বসে তাঁর চেয়ারের হাতলে মাথা রেখে শুনছি। পড়ার শেষে, আত্মচরিত লেখা কত কঠিন সে সম্বন্ধে না না সুবিধা অসুবিধার কারন বলে হেসে বললেন,”আমার জীবন চরিত কেউ লিখতে পারবে না। দেখ না তুই চেষ্টা করে। এই ভাবে শুরু কর- বলে তিনি অতি বিশুদ্ধ ভাষায় দু-তিন লাইন, কোথায় শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মেছেন সে-বৃত্তান্ত, বলতে বলতে স্নিগ্ধ হাসিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সেক্রেটারি সেদিনের ডাক, মানে একগাদা চিঠি এনে হাতে দিলেন।“
কলম ধার
একবার এক ভদ্রলোক রবীন্দ্রনাথের কাছে কলম ধার চাইলেন। তিনি কলম চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এই কবিতার দ্বিতীয় লাইনটা জানেন? প্রথম লাইনটা হচ্ছে ‘সকল পক্ষী মৎস্য ভক্ষী, মৎস্যরাঙ্গী কলঙ্কিনী'।
রবীন্দ্রনাথ কলমটা দিয়ে বললেন, 'নিশ্চয়ই জানি। লাইন দুটো দাঁড়াল এ রকম : 
সকল পক্ষী মৎস্য ভক্ষী, 
মৎস্যরাঙ্গী কলঙ্কিনী। 
সবাই কলম ধার চেয়ে নেয়, 
আমিই শুধু কলম কিনি!'
উপুড় কলসী
জীবনের শেষ দিকে এসে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে উবু হয়ে লিখতেন। একদিন তাঁকে ওভাবে উবু হয়ে লিখতে দেখে তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী বলল, ‘আপনার নিশ্চয় ওভাবে উপুড় হয়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে এখন এ রকম অনেক চেয়ার আছে যেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বেশ আয়েশের সঙ্গে লিখতে পারেন। ওরকম একটা আনিয়ে নিলেই তো পারেন।’ লোকটার দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ জবাব দিলেন, ‘তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়! পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়।'
জীবনের কঠিনতম সময়ের সঙ্গেও পরিহাস করতে ভোলেননি কবি। 
নতুন আলো
নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গল্পের রবী্ন্দ্রনাথ’ বইতে লিখছেন যে ১৯৪১ সালের ২৫শে জুলাই অসুস্থ কবি শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেলেন। শান্তিনিকেতনে তখন পুরোনো আলোর বদলে নতুন ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজ চলছে। তা দেখে কবিরউক্তি,”এখন বুঝি পুরোনো আলো গিয়ে নতুন আলো আসবে?” দিন বারো বাদে কবি নিজেই আলোকযাত্রী হলেন জোড়াসাঁকোয়, ৬ অগস্টের দুপুরে।
ছোট ছোট খোঁচা
তাপস রায় তাঁর ‘হাস্যরসিক রবীন্দ্রনাথ’ এ আরও এরকম উদাহরন দিয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ কবিকে কলকাতা আনা  হয়েছে। ১৯৪১ সালের ৩০শে জুলাই ঠিক হল জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই কবির অস্ত্রোপচার করা হবে। অস্ত্রোপচারের তাঁকে রোজ গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এই নিত্যদিন সূঁচ ফোটানো তাঁর বিন্দুমাত্র পছন্দ নয়। তাই পরিহাসছলে কবি জানতে চাইলেন,”বড় খোঁচার ভূমিকাস্বরূপ এই ছোট ছোট খোঁচা আর কতদিন চলবে?”
একটূ হাসো
যথাসময়ে কবির একটি ছোট অস্ত্রোপচার হল তৎকালীন প্রখ্যাত শল্য চিকিৎসক ললিত মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। ঠিক হল এটি সফল হলে বড় অস্ত্রোপচার হবে। পরদিন অর্থ্যাৎ ৩১ জুলাই ১৯৪১ কবি কিরকম রয়েছেন জানতে নির্মলকুমারী মহলানবিশ তাঁর শিয়রে এসে দাঁড়ালেন। কবি চোখ বুজেই শুয়েই ছিলেন। হঠাৎ ‘হাঃ’ শব্দ করে চোখ বড় বড় করে এমন মুখভঙ্গী করলেন নির্মলকুমারী না হেসে পারলেন না।  কবি বললেন,”এই তো, একটু হাসো। তা না গম্ভীর মুখে এসে দাঁড়ালেন। এত গম্ভীর কেন?” পরে সেই ঘটনা মনে করে তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ বইতে রবীন্দ্রনাথের এক সময়ের সচিব ও ভারতে পরিসংখ্যান বিজ্ঞানের জনক প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ জায়া লিখছেন,”হাসির সঙ্গে চোখে জল এল। এখনও উনিই আমাদের হাসাচ্ছেন। বুঝেছেন সকলেরই মন খারাপ, তাই মনের ভার হাল্কা করে দেবার চেষ্টা।“
পুলক চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘রসিক রবীন্দ্রনাথ’ বইতে লিখছেন,”রসিকতা করলেও দীর্ঘ জীবনে তিনি কখনও অমার্জিত ভাষা প্রয়োগ করেননি। কারণ শুধু ভাষার ক্ষেত্রে নয়, আচার আচরনেও তিনি সবসময় পরিশীলিত ছিলেন। সাধারনত অনেকসময় দেখা যায় কৌতুকপ্রিয় মানুষ বিষয়বস্তু ও ভাষার ক্ষেত্রে সংযম প্রকাশ করেন না। রবীন্দ্রনাথ এদিক থেকেও উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।
তাই তো তিনি লেখেন,
“কোনওকালে বৃদ্ধ হব নাকো আমি, 
হাসি তামাসারে কব ছ্যাবলামি।“

তথ্যসূত্র 
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন-প্রমথনাথ বিশী
আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ-রাণি চন্দ
রবী্ন্দ্রনাথ-প্রমথ চৌধুরি 
গল্পের রবী্ন্দ্রনাথ-নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় 
হাস্যরসিক রবীন্দ্রনাথ-তাপস রায়
রসিক রবীন্দ্রনাথ-হিরন্ময় ভট্টাচার্য
রসিক রবীন্দ্রনাথ-পুলক চট্টোপাধ্যায়
 


Liked our work ?