Loading...

চিরন্তন এক ক্রিকেট রূপকথা

কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়

সত্তর দশকের শেষ দিক সেটা। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। উত্তর কলকাতার এক চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে কিন্তু চায়ের কাপে তুফান চলছে তো চলছেই, থামার কোনও নামই নেই। দোকানের বিস্কিট আর বাপুজি কেকের বয়মগুলোর পিছনে মার্ফি রেডিওতে চলছে সুদূর চেন্নাইতে চলা এক টেস্ট ম্যাচের ধারাবিরনী  আর তার তালেই তাল মিলিয়ে আড্ডার পারদ চড়ছে নামছে।
বেঞ্চের উপর সশব্দে চায়ের কাপটা নামিয়ে একজন হতাশ গলায় বলল, “ধুস গাভাসকারই আউট। আর কি হবে?”
চারমিনারে লম্বা একটা টান দিয়ে নিস্পৃহ গলায় আর একজন বলল, “কি আর হবে? সানি গিয়েছে তো কি হয়েছে? ভিশি আছে না? ঠিক সামলে দেবে।“
ভিশি অর্থ্যাৎ বিশ্বনাথ। কন্নড় এই ব্যটারের পুরো নাম গুণ্ডাপ্পা রঙ্গনাথ বিশ্বনাথ। বিগত শতকের ৭০ দশকে ‘লিটল মাস্টার’ সুনীল মনোহর গাভাসকারের পাশে সমান উজ্জ্বল এই আরেক ‘লিটল মাস্টার। মাস্টারই বটে। বেদি-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখর-বেঙ্কটরাঘবন এই স্পিনার চতুষ্টয়ের পাশাপাশি ক্রিকেট বিশ্ব যে দুই ভারতীয় ব্যাটারকে সমীহ করত, তা হল এই সানি-ভিশি জোড়ি। একথা বললে অতুক্তি হবে না যে ৭০ র দশকে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের ভরকেন্দ্র ছিলেন এই দুই ‘লিটল মাস্টার। ওপেনার গাভাসকার আউট হলেও আমজনতা খোঁজ নিত ভিশি ক্রিজে আছেন কি না। অধিকাংশ সময়ই যার উত্তর হত হ্যাঁ। রেডিও ধারাবিবরনীর সেই যুগে আমজনতার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কন্নড় যতক্ষন ব্যাট হাতে বাইশ গজ শাসন করবেন, যতক্ষন কব্জির মোচড় দেওয়া তাঁর সিগনেচার স্কোয়ার কাট সবুজ ঘাসের গালিচা চিরে বাউন্ডারি লাইনে আছড়ে পড়বে, ততক্ষন ভারতের চিন্তার কিছু নেই।
তিনি, গুণ্ডাপ্পা রঙ্গনাথ বিশ্বনাথ, ৯১ টেস্ট ধরে আসমুদ্র হিমাচলের এই বিপুল প্রত্যাশার হিমালয়ের চাপ সামলিয়েছেন। আর বেশিরভাগ সময়ই অগ্নিপরীক্ষায় সসন্মানে উৎরেছেনও। আর আশ্চর্য্য হল তাঁর ১৪টি শতক করা টেস্টের কোনওটিতেই ভারত হারেনি, সবসময় তাঁর চওড়া ব্যাট ভারতকে বাঁচিয়েছে। তাঁর আত্মজীবনী ‘রিস্ট অ্যাসিওর্ড’-  এ ভিশি বলছেন,” আমি সব ম্যাচে হয়ত সেঞ্চুরি করতে পারিনি, কিন্তু যখনই মাঠে নেমেছি নিজের শতকরা একশো ভাগই দিয়েছি। খেলা ছাড়ার পর জানতে পারলাম, যেসব ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছি, ভারত সেইসব ম্যাচ হারেনি। এটা আমার কাছে স্বস্তিদায়ক। ১৪টার বেশি সেঞ্চুরি করতে পারলে কি ভাল লাগত? নিশ্চয়ই লাগত। কিন্তু আজ যখন ফিরে তাকাই আমার সেঞ্চুরি করা ম্যাচগুলোয়, যেখানে হয় ভারত জিতেছে নয়ত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর দাঁতে দাঁত চেপে ম্যাচ ড্র করেছে।“
তাই সেই প্রচারবিমুখ আপাদমস্তক ভদ্রলোক ক্রিকেটারের আত্মজীবনী যখন হাতে আসে, তখন ক্রিকেট প্রেমী হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত হই। ২৬৭ পাতার হার্ডকভারের ‘রিস্ট অ্যাসিওর্ড’ নামের এই বইয়ে ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা মিডল অর্ডার ব্যাটার শুনিয়েছেন তাঁর জীবনকাহিনী। 
কাহিনীর শুরু ২০১৯ র ১২ই ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় বেঙালুরুর কর্নাটক গল্ফ অ্যাসোসিয়েশনের লাগোয়া রয়াল অর্কিড রেস্তোঁরায় তাঁর ৭০ তম জন্মদিনের পার্টি দিয়ে। কে না ছিলেন পার্টিতে? শ্যালক সুনীল গাভাসকার থেকে শুরু করে বাইশ গজের সহযোগী সৈয়দ কিরমানি, রজার বিনি, ব্রিজেশ প্যাটেল, ভাগবৎ চন্দ্রশেখর, ভরত রেড্ডি, অংশুমান গায়কোয়াড় থেকে শুরু করে পরের প্রজন্মের  অনিল কুম্বলে, ভেঙ্কটেশ প্রসাদের মতো দিগপাল সব খেলোয়াড়। স্ত্রী কবিতা ও ছেলে দৈবিকের সঙ্গে সেই সন্ধ্যা যে তাঁর মনে দাগ কেটেছে তা বিশ্বনাথ বার বার বলেছেন।
ভিভিএস লক্ষনের আত্মজীবনী 281 and beyond র সহ লেখক অভিজ্ঞ ক্রীড়া সাংবাদিক আর. কৌশিক বিশ্বনাথের এই আত্মজীবনীরও সহলেখক। দীর্ঘদিনের পরিচিত সাংবাদিক কৌশিকের সামনে তাই নিজের কাহিনী পরতে পরতে খুলতে বিশ্বনাথও দ্বিধা করেননি। শুনিয়েছেন জীবনের কত না ছোট ছোট গল্প। সাত আট বছরের এক বালকের টেনিস বলে ক্রিকেটে হাতে খড়ি হওয়া থেকে ক্রিকেট পাগল দাদা জগন্নাথের সকালে উঠে রেডিওর ধারাবিবরনী শুনে স্কোরবোর্ড টোকা আর সেই স্কোরবোর্ড থেকে বাঁ হাতি নীল হার্ভের নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, ১৯৬০ সালের জানুয়ারি মাসে সেই স্বপ্নের নায়ককেই বেঙালুরুর সেন্ট্রাল কলেজ গ্রাউন্ডে ব্যাট করতে দেখা, পরদিন শুধু হার্ভের হাতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে ৪৫ মিনিট দূরের বিশ্বেশ্বরা কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এ যাওয়া, হার্ভেকে ছুঁয়ে সেই আনন্দে বিভোর হয়ে সারা রাস্তা দৌড়ে বাড়ি আসা। এই ঘটনার আঠার বছর পরে ১৯৭৮ সালে বিশ্বনাথের সঙ্গে নীল হার্ভের দেখা হয়। হার্ভেকে ১৯৬০ র ঘটনার কথা বলতে প্রবাদপ্রতিম বাঁহাতি অজি বলেন,”you must have been crazy, I am sure you must be meeting a few of those yourself, now that you have become famous and have been playing for India for a number of years. Must be exhilarating?” বিনম্র বিশ্বনাথ বলছেন, হার্ভের সান্নিধ্যই তাঁকে উল্লসিত করছে। 
জীবন যে কত ভাবে তাঁকে বিনম্র হতে শিখিয়েছে, তার উল্লেখও করেছেন বিশ্বনাথ। কানপুরের যে গ্রিনপার্কে এক ডজন ইনিংসে তাঁর গড় ৮৬.২২, গোটা তিনেক সেঞ্চুরি আর ৪টে হাফ সেঞ্চুরি আছে যে মাঠে, যে মাঠের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ভিশিজ গ্রিন’বলে, ১৯৬৯ সালের ১৫ নভেম্বর জীবনের প্রথম টেস্ট ইনিংসে  শূন্য করে প্যাভিলিয়নে ফেরার পথে দর্শকরা যে তাঁকে শুধু বিদ্রুপ করেছেন তাই নয়, তাঁর দিকে চায়ের ভাঁড়ও ছুঁড়েছেন।
পরে ভিশি লিখেছেন,”গোটা কেরিয়ারে ফ্যানরা তো সবসময়ই আমার পিছনে ছিল। শুধু ওই কানপুরের চায়ের ভাঁড় ছোড়া আর ইডেনে কিথ ফ্লেচারের ইংল্যান্ড টিমের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হওয়ার পচা কমলালেবু ছোড়ার মত দু-একটা ছোটখাট ঘটনা বাদ দিলে। কানপুরের দর্শকরা আসলে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শিক্ষা দিয়ে দিয়েছিল।“ 
তবে এখানে কলকাতাবাসী হিসাবে আর ক্রিকেটপ্রেমী হিসাবে ছোট্ট দুটো অনুযোগ আছে। প্রথমে কলকাতাবাসী হিসাবেই বলি। পরিসংখ্যান বলছে ১৯৬৯ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত ইডেনে মোট ৮ টা টেস্টের ১৫টা ইনিংস খেলেন ভিশি। এর মধ্যে ১৯৭৪ এ ডিসেম্বরে ক্লাইভ লয়েডের সেই বিশ্বত্রাস পেসার চতুষ্টয়ের বিরুদ্ধে তাঁর চিরস্মরনীয় ১৩৯ বা ১৯৭৭ এর অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে করা ৯৬ র কথা মনেই পড়ল না? তাঁকে নিয়ে ইডেন জুড়ে  লক্ষাধিক দর্শকের প্রাণঢালা উন্মাদনা বেমালুম স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেল? রয়ে গেল শুধু পচা কমলালেবুর তিক্ত স্মৃতি? অথচ কলকাতার স্মূতির ভাণ্ডারে ৪৮ বছর আগে ইডেনের  ওই ১৩৯ আজও জ্বলজ্বল করছে।
ক্রিকেটপ্রেমী হিসাবে অনুযোগ হল বইয়ের পরিশিষ্টে এতবড় মাপের ব্যাটারের তাঁর ক্রিকেট জীবনের বিশদ পরিসংখ্যান না থাকাটা বড়ই দৃষ্টিকটু। আশা করি পরবর্তী সংস্করনে এটা সংযোজিত হবে।
আরও একটা কথা। ভিশিকে নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর গুরুত্ব নিয়ে এই বইয়ে একটা মুখবন্ধ বড় জরুরি। আর এই কাজটা গাভাসকার ছাড়া আর কেউ করতে পারেন কি? মাঠের ভিতরে ও বাইরে ভিশিকে যারা সব থেকে কাছ থেকে দেখেছেন, তার মধ্যে এই মুম্বইকরের নাম সর্বপ্রথমে আসে।
মহানুভবতার অন্য শিক্ষাও ভিশি পেয়েছেন জীবনের প্রথম টেস্টেই। অধিনায়ক মনসুর আলি খান পাতৌদি প্রবলভাবে সমালোচিত হন জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও দ্বিতীয় ইনিংস ডিক্লেয়ার করতে দেরি করেন। ফলে নিশ্চিত জয় ভারতের হাতছাড়া হয়। পরে মজার ছলে পাতৌদি ডিক্লেয়ার দেরি করার আসল কারন ভিশিকে বলেন। পাতৌদি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম তুমি দেড়শো কর। প্রথম টেস্টে আজ পর্যন্ত কোনও ভারতীয়  দেড়শো করেনি। তাই তোমাকে বাড়তি কিছু সময় দিচ্ছিলাম যাতে ১৫০ করতে পার।“ পাতৌদির আশা অবশ্য পূর্ণ হয়নি। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরের কানপুরে জীবনের প্রথম টেস্টে ভিশি করেছিলেন ১৩৭।
তবে এই ১৩৭ র মূল্য ভিশির কাছে ছিল অনেক বেশি। কারণ এরপর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি নিজেই লিখছেন,”এই শতরানের পরে তৎকালীন সুপারস্টার রাজ কাপুরের কাছ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে টেলিগ্রাম আসে। টেলিগ্রাম পেয়ে বুঝলাম যাক কোনও একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি। অন্তত এই সিরিজের বাকি তিন টেস্টে বাদ যাব না। বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড় প্রথম ব্যর্থতার পর হারিয়ে যায়। অনেক খেলোয়াড়ের উপর আবার প্রথম ব্যর্থতার বোঝা এমনভাবে চেপে বসে ফের সুযোগ পেয়েও কিছু করতে পারে না। আমার অসীম সৌভাগ্য যে আমি ওইধরনের ভুলভুলাইয়ে আটকা পড়িনি।“
আসলে বিশ্বনাথরা একটা সময়ের প্রতীক। পৃথিবী তখন কি একটু হলেও শান্ত ছিল? সাদা পোষাক আর লাল বল ছিল ক্রিকেট কৌলিন্যের শেষ কথা। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন তখনও আর্থার সি ক্লার্কের কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে পাওয়া যেত। তাই সেই যুগে সবুজ গালিচা চিরে বিশ্বনাথের স্কোয়ার কাট বাউন্ডারির ঠিকানা খুঁজে নিত। মাঠ তখন ভরে যেত সমবেত করতালিতে। সাদা টুপি খুলে বিশ্বনাথেরা করতালির অভিনন্দন স্বীকার করতেন। ওদিকে তখন মাঠের পাশে থাকা কাঠের স্কোর বোর্ডে পিছন থেকে হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্যাটসম্যান ফোর এর পাশের তিনটি খোপে পর পর ১,০,০ সংখ্যা তিনটি বসানো হচ্ছে। সাহেব ধারাভাষ্যকার বলে চলেছেন, “India’s other little master has reached yet another century.”
তাই ৯১ টেস্টে ১৪টা সেঞ্চুরি সহ হাজার ছয়েক রানের মতো শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে ভিশিকে বোঝা যাবে না। “আরে ভিশি তো আছে। চিন্তা কি?” ভিশি মানে আসমুদ্র হিমাচলের  এই কথা বলার ভরসা।
ভিশি মানে আপাদমস্তক ভদ্রতাও। না হলে পরাজয় হতে পারে জেনেও বিপক্ষ দলের আউট ঘোষিত হওয়া ব্যাটারকে কেউ ফের ক্রিজে ডেকে আনে? নিজের আত্মজীবনীতে দেওয়া ৩৪টা ছবির মধ্যে ৯টা ছবিই পরম সুহৃদ তথা শ্যালকের গাভাসকারের থাকে? শেষ কবে কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের আত্মজীবনীতে এই জিনিষ দেখা গিয়েছে তা জানা নেই। তবে নিজেই নিজের ঢাক পেটানোর যুগে আর এই জিনিস আর কোনওদিন দেখা যাবে কি না তা নিয়েই ঘোর সন্দেহ আছে।
তাই ক্লাসিকস চিরন্তন। তাই এই বিশ ওভারি ধুমধড়াক্কা খেলার যুগেও বিশ্বনাথরা হারিয়ে যান না। খেলাটার সত্যিকারের রূপ জানতে হলে, ক্লাসিক্যাল ব্যাটিং দেখতে হলে গুণ্ডাপ্পা রঙ্গনাথ বিশ্বনাথদের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
 


Liked our work ?