Loading...

পরিবর্তন

তাপস কুমার দে

আমি ভারী ভালোমানুষ। সেটা অবশ্য আমার বউ স্বীকার করে না, ছাড়ুন সে কথা, কোনদিন আর বউরা স্বামীর প্রশংসা করেছে।তবে হ্যাঁ, আমি ভুলো মনের মানুষ। মাঝে মাঝে মনেই পড়ে না , যে আমি বিয়ে করেছি , আর ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের কথা যত ভুলে যাওয়া যায় ততই ভালো। বিবাহ বার্ষিকীর কথা আমার মনে থাকে না, বৌ এর জন্মদিনের কথা মনে থাকে না। বৌকে  একথা বোঝাতে পারি না যে বিয়ের কথাই আমার মনে নেই আর বিয়ে না থাকলে বউ কোথায়?? বউ যখন "ওগো শুনছো " বলে, তখন মাঝে মাঝে হা করে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে ভাবি এই মহিলা কে? তারপরে যখন খেঁকিয়ে ওঠে, তখন ছোটবেলার রমা দিদিমণির মুখটা ভেসে ওঠে। এরকমই খেঁকিয়ে উঠলেই আমরা হাত পেতে দিতাম আর ঠাস করে স্কেলের বাড়ি পড়তো। অবশ্য বউ স্কেলের বাড়ি দেয় না, মিষ্টি করেই বলে -" অপদার্থ একটা "। ছাড়ুন এই সব দুঃখের কাহিনী, কিছুদিন আগের একটা গপ্পো বলি। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বারান্দায় বসে আছি। কোথা থেকে জানি না, খাবারের সুগন্ধ ভেসে আসছে। বউ মেয়েকে নিয়ে তার বাপের বাড়ী গেছে, আমি স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে একটু এক্সট্রা স্বাধীনতা ভোগ করছি। বারান্দায় হালকা হালকা হাওয়া দিচ্ছে, চানাচুর আর বাদাম সহযোগে সবে একটা মেরেছি, হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ। যাব্বাবা, বউ ফিরে এলো নাকি? পঙ্কজ উদাস YouTube এ সবে গান ধরেছেন - " থোড়ি থোড়ি পিয়া করো ", আমার মনটা হালকা উদাস হচ্ছে, পঙ্কজ উদাসের সাথে, এই সময় বউ ফিরে আসলে তো ভারী গোলমাল। সব কিছু লুকিয়ে দরজার কাছে যাওয়ার সাথে সাথে আবার কলিং বেলের আওয়াজ। বুঝতেই পারছি ভয়ঙ্কর জেরার মুখে পড়বো, মুখের গন্ধও শুকবে খেঁকি কুত্তার মত। দরজা খুলে তো আমি অবাক। উপরের ফ্ল্যাটের ঝুমা বৌদি সেক্সি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো মেঘ না চাইতে জল। সুগার পেশেন্ট হওয়ার আগে থেকেই আমি সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ভীষণ মিষ্টি হয়ে যাই, সুগার হওয়ার পর সেই মিষ্টি বোধহয় আর একটু বেড়েছে। গলায় চিনি আর মধু একসাথে ঢেলে বললাম - " ওমা!!আপনি, কি সৌভাগ্য !!"  ঝুমা বৌদি হালকা হেসে বলল - " বউ বাড়িতে নেই, তাই না?? " উড়ি শালা, এ তো পুরো শার্লক হোমস। আমি পিছলে পড়া খেঁকশিয়ালের মতো খ্যাক খ্যাক করে হতভম্বের হাসি হেসে বললাম - " কী করে বুঝলেন ?? আপনার তো সিবিআই তে থাকা উচিত, কি দারুণ কল্পনাশক্তি। " ঝুমা বৌদি চোখের কোণে মিচকি হেসে বলল - " এটা বোঝার জন্য বুদ্ধিমান হতে হয় না,  মশাই। প্রথম কথা, আপনি আমাকে যেভাবে সম্বর্ধনা করলেন সেটা বৌ থাকলে করতেন না, আর দ্বিতীয় আর প্রধান কথা হচ্ছে, মুখ দিয়ে ভুরভুর করে লাল জলের গন্ধ বেরোচ্ছে। " আমি খাবি খাওয়া কাতলা মাছের মত চোখ করে হাসলাম। বৌদি মুচকি হেসে বলল- "সন্ধ্যেবেলা চা কি খাওয়া হয়েছে, নাকি লাল জলের উপরেই আছেন ?? " বাঙালি সংস্কৃতিবান জাতি, পেটে দারু থাকলে আমার বঙ্গ সংস্কৃতিবোধ অন্যান্য বাঙ্গালীদের মতোই বেড়ে যায়। আমি হালকা হেসে রবীন্দ্রনাথ আওড়ালাম -

"অভয় দাও তো বলি আমার

wish কী–

একটি ছটাক সোডার জলে

বাকী তিন পোয়া হুইস্কি ।। "

বৌদি মুচকি হেসে বলল -

 

" কত কাল রবে ভারত হে,

শুধু ডাল ভাত জল পথ্য করে

দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন,

ধর হুইস্কি, সোডা আর মুরগী মটন।

কত কাল রবে ভারত হে! "

আমি ঠিক এইরকম প্রত্যুত্তর আশা করিনি। খানিকটা ভেবলে গেলাম। বৌদি একটা সেক্সি হাসি দিয়ে বলল - " কি sir, চমকে গেলেন নাকি? একটু আধটু রবীন্দ্রনাথ আমিও পড়েছি, sir. অবশ্য বিদ্যে উচ্চ মাধ্যমিক ফেল, তাই বোধহয় অবাক হচ্ছেন। বাবার ইচ্ছে ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হই, জোর করে সায়েন্সে ভর্তি করে দিল আর আমিও সফলতার সাথে ফেল করে গেলাম, তারপর সফল ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিল । যাক অনেক কথা বললাম, এবার একটু চিনি দিন। বাজারে কে একটা মারা গেছে, সব দোকান বন্ধ আর বাড়িতে চিনি নেই। " আমি একটু স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করে বললাম - " দাদা বাড়ি ফিরে চা খাবে বলে এত আগের থেকেই তোড়জোড়? " বৌদি ঝরনার মত হেসে বলল - " কোথায় দাদা ? তিনি তো চার দিনের জন্য পাটনায় গেছেন। শুক্রবার রাত্তিরে ফিরবে। আমি ফ্ল্যাটে একা,  দাও হে দেখা টাইপ হয়ে পড়ে আছি। " মনে মনে বললাম - "উড়ি শালা, দাদাও নেই, আমার বৌও নেই। আহা!  কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।" আমি লোভী হায়নার মত চোখ মুখ করে বললাম - " তাহলে আর ফাঁকা ফ্ল্যাটেতে ফিরে গিয়ে কি করবেন ? এখানেই বারান্দায় বসে আড্ডা মারি দুজনে, কি বলেন ? আর আমি চা করে নিয়ে আসছি, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।" বৌদি হালকা হাসলো। বলল - " একে এখনকার ভাষায় কি বলে জানেন ? চান্স পে ডান্স।  চলুন, বারান্দায় বসি। চা করতে হবে না, একটু লাল জলই দিন, নাকি কম পড়ে যাবে?"

ভাবুন মাইরি বিষয়টা, ভগবান যব দেতা হ্যায়, ছপ্পড় ফারকেই দেতা হ্যায় !! শালা,কার মুখ দেখে উঠেছিলাম কে জানে, নিজের মুখই হবে,  বাড়িতে তো আর কেউ নেই।

একটা হাই- সুগার মার্কা হাসি দিয়ে বললাম - "ওমা কম হবে কেন ? আর এখন তো বললেই মাল বাড়িতে দিয়ে যায়, চাপ নেই কোন।" বলেই আর দেরী করলাম না, রান্নাঘর থেকে ছুটে গ্লাস নিয়ে বৌদির সামনে সাজিয়ে দিলাম।বাদাম আর চানাচুর মোটামুটি আগের থেকেই সাজানো ছিল। বৌদিকে মাল ঢালা সাথে সাথেই ঢকঢক করে একবারে মেরে দিল। আমি করছেন কি,  করছেন কি বলার পর্যন্ত সুযোগ পেলাম না। ভ্যাবলাকান্তর  মত তাকিয়ে থাকতে দেখে বৌদি খিলখিল করে হেসে উঠলো। যা শালা, নেশা হয়ে গেল নাকি?? বৌদি চোখ মেরে বলল - " কি sir, ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? " মাইরি বলছি, বুকের ভিতরটা আমার কি রকম গুড়গুড় করে উঠলো, প্রেমে না ভয়ে বুঝতে পারলাম না। বৌদি হঠাৎ বলে উঠলো -

" এভাবে নয়, এভাবে ঠিক হয় না

নদীর বুকে বৃষ্টি পড়ে, পাহাড় তাকে সয় না

এভাবে নয় , এভাবে ঠিক হয় না।

কিভাবে হয়? কেমন করে হয়?

কেমন করে ফুলের কাছে রয়

গন্ধ আর বাতাস দুইজনে

এভাবে হয়, এমনভাবে হয়। "

আমিও এর মধ্যে টুকটুক করে একটা মেরেছি, নেশা হালকা চড়েছে,  তারপর আবার একজন সুন্দরী পরস্ত্রী কবিতা আওড়াচ্ছে, টোটাল ককটেল পরিবেশ। আমি ঈষৎ জড়ানো গলায় বললাম - " কবিতাটা ব্যাপক, আপনি লিখেছেন ? "  বৌদি শ্লেষের হাসি হেসে বলল - " আমারই ভুল হয়েছে, অশিক্ষিতদের কবিতা শোনাতে নেই। এটা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। সারা জীবন কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করলেও আমার হাত দিয়ে এসব লেখা বেরোবে না। আমার বরটাও  অশিক্ষিত, শুধু টাকা চেনে। আমি সারা জীবন কবিতা লিখতে চেয়েছিলাম, কবিতার ভিতর বাঁচতে চেয়েছিলাম। " বৌদির সারা শরীর জুড়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।

হঠাৎ আমার নিজের বোনটার কথা মনে পড়ে গেল, মেয়েটা বড় লিখতে ভালোবাসতো। অঙ্কের খাতার একধারে কবিতা লিখে ছবি এঁকে রাখত। ক্লাস ten এ অঙ্কে ফেল করলো, বাবা যাচ্ছেতাই বকলো, আমি তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। সেদিন রাত্তিরেই আত্মহত্যা করলে আমার বোনটা। অঙ্কের খাতাতে বড় করে লেখা ছিল - " আমি কবি হতে চেয়েছিলাম । "

মদের কারণে কিনা জানি না, আচমকা প্রচন্ড ঘাম হতে আরম্ভ হল। অসম্ভব শরীর খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল অনেক দূর থেকে বৌদির গাঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, হাতে গ্লাস নিয়ে বৌদি বলে চলেছেন -

"এত‌ই অসাড় আমি, চুম্বন‌ও বুঝিনি।

মনে মনে দিয়েছিলে, তাও তো সে না-বোঝার নয়-

ঘরে কত লোক ছিল, তাই ঋন স্বীকার করিনি।

ভয়, যদি কোনো ক্ষতি হয়।

কী হয় ? কী হতে পারত ? এসবে কি কিচ্ছু এসে যায়?

চোখে চোখ পড়ামাত্র ছোঁয়া লাগল পাতায়-

সেই তো যথেষ্ট স্বর্গ- সেই স্পর্শ ভাবি আজ। সেই যে অবাক করা গলা

অন্ধকারে তাও ফিরে আসে…

স্বর্গ থেকে আরো স্বর্গে উড়ে যাও আর্ত রিনিঝিনি

প্রথমে বুঝিনি, কিন্তু আজ বলো, দশক শতক ধ’রে ধ’রে

ঘরে পথে লোকালয়ে স্রোতে জলস্রোতে আমাকে কি

একাই খুঁজেছ তুমি ? আমি বুঝি তোমাকে খুঁজিনি ?"

মাতাল, অশিক্ষিত, অতি বদ আমি বৌদির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম -

" এই মেয়ে, আমাকে ভাইফোঁটা দিবি ? "

অলংকরণ - নিলয় মজুমদার 

 


Liked our work ?